
সিদ্ধার্থশেখর চক্রবর্তী
যে কোনো আখ্যান মূলত দুভাবে বলা যায় – পাঠককে সাথে নিয়ে, যাতে লেখার প্রতিটি স্তরে পাঠকের সদর্থক অংশগ্রহণ থাকে অথবা লেখক নিজেই লেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে পাঠকের সামনে প্রস্তুত হওয়া নির্মানটি উপস্থাপন করে। সমরেশ মজুমদার তাঁর লেখায় সম্পূর্ণ তৃতীয় পন্থা আবিষ্কার করেছিলেন।
আজকের দিনে যখন আলোচনায় উঠছে, পাঠ এবং পুনঃপাঠের নিশ্চলতা, শব্দের ভেতর অনায়াসে লিখে রাখা নৈঃশব্দ্য এবং ভিন্ন সামাজিক সময়ে অবস্থান করা পাঠকের কাছে পৌঁছে যাবার যৌক্তিকতা- তখন সমরেশ মজুমদারের কালজয়ী উপন্যাসগুলো মনে পড়তে বাধ্য। তিনি ভাষার ছলচাতুরী করে অথবা চটজলদি সাময়িক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে পাঠককে জয় করতে চাননি। এটা তো অনস্বীকার্য সত্য যে, একটি লেখার ক্ষেত্রে লেখক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই ভূমিকা থাকে পাঠকের। পাঠক ঠিক করে নেন কোন লেখা থেকে কি তাৎপর্য নিংড়ে নেবেন, নিরুচ্চারিত অন্তর্বয়ন অর্জন করা সম্ভবপর কি না, পাঠ থেকে পুনঃপাঠে পৌঁছে যাবার পথটি অতিক্রম করে নেবার তাগিদ অনুভব করা যায় কি না। ধ্রুপদী সাহিত্য যে কারণে এখনো গ্রহণযোগ্য, সমরেশ মজুমদারের অধিকাংশ উপন্যাসই সেই একই কারণে বর্তমান যান্ত্রিক যুগেও অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে। প্রতিটি বয়ানে ভঙ্গুর যাপনের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে উন্মোচিত হয় উত্তরণের প্রতিক্রিয়া।
এক্ষেত্রে সার্ত্রের সেই বিখ্যাত কথা মনে পড়ে যায়, ‘যত কালো রঙেই কোনো লেখক পৃথিবীকে আঁকুন না কেন, তাঁর রঙ লাগাবার একটাই উদ্দেশ্য, যাতে স্বাধীন মানুষ সেই ছবির দিকে তাকিয়ে তাদের স্বাধীনতা অনুভব করতে পারে, কিন্তু সে নিরাশাবাদী নয়।’
সমরেশ মজুমদার সেই বিরল কথাসাহিত্যিকদের একজন, যিনি পাঠকের দাবি গ্রহণ করেও শিল্পের আবশ্যিক শর্ত জায়মান রেখে নিজস্ব বৃত্তের পথ খুঁজে বের করে নিতেন। চিরকালীন সদর্থক এক নিরপেক্ষ মানসিকতার ধ্বজা উড়িয়ে যাবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার গল্পে। উত্তরণের ছাপ ছিল স্পষ্ট। সমকালীন মানুষের চলমান জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার অদম্য ক্ষিদে এবং তাঁর যথার্থ প্রয়োগ তার মজ্জাগত ছিল। আর ছিল, আপাতভাবে সাধারণ এক কাহিনী সহজ করে লিখে আলাদা এক বিন্যাস তৈরি করার। সহজলভ্য আশাবাদের প্রলোভনের ফাঁদে না জড়িয়ে স্থিতাবস্থার পারস্পরিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাস্তব উত্তরণের বুনন করতেন তিনি।
জীবনের তুচ্ছ বিষয়গুলোর মধ্যে গভীর অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ভাবন ঘটিয়ে উপন্যাসের ভেতর পাঠককে নিবিষ্ট রেখে সাহিত্যের রস আস্বাদন করানো তখনই সম্ভব যখন লেখক নিজেকে নিয়োজিত রাখেন চিন্তন পাঠে। ভালো লেখক হবার জন্যে ভালো পাঠক হওয়া জরুরি। তার লেখায় জীবন যাপনের নিরন্তর দার্শনিক অনুসন্ধান এবং বিশ্লেষণিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে বোঝা যায় তার পড়াশোনার ব্যাপ্তি কতটা ছড়ানো ছিল। একেকটি ব্যাখ্যার দ্যোতনা নিয়ে কতটা ভাবতেন তিনি। কাহিনীর প্রতীতি এবং চরিত্রের ব্যক্তিসত্তার অভিপ্রায় সম্পর্কিত পথ হারিয়ে ফেলা এবং ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রমাণ করে চিন্তাবিদ হিসেবে তার সার্থকতা। জীবন অভিজ্ঞতার তুখোড় মেধাবী ছাত্র না হলে এভাবে অনায়াসে যাপন লেখা সম্ভবপর হয়ে উঠত না।তার প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’এর রাকেশ হোক অথবা কালবেলার অনিমেষ – সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে নিজস্ব স্বর সন্ধান করার আকুতি সচেতন ভাবেই পাঠ অভিজ্ঞতাকে জীবন দর্শনের উপলব্ধির স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
সময় ঠিক করে দেয় পুনঃপাঠের যৌক্তিকতা। সহজ লেখার ছন্দ নির্ধারণ করে পাঠকের আত্মতৃপ্তি। অক্ষরের মধ্যেকার নীরবতা দেখিয়ে দিয়ে যায় অমোঘ বাস্তবতা। পাঠকের কাছে গল্প হয়ে ওঠে জীবন্ত আয়নামানুষ। ভেতরে বসে আগ্রহী করে তোলে যুক্তিগ্রাহ্য অস্তিত্বের মানবিক সন্ধান পেতে। গল্পের সার্থকতা তখনই স্পষ্ট হয় যখন অজান্তেই পাঠক সূচিশীল্পের সূক্ষ্মতা এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাষার সৌন্দর্য উপেক্ষা করার চেষ্টা করলেও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজস্ব জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তোলে কাহিনীকে। যে কোনো লেখাই বাস্তব থেকে গৃহীত হলেও সব পাঠ কি বর্ণিত অঙ্কে জীবন উদ্ভাসিত করতে পারে? অনুপম শব্দের মাধুর্যে নিরস অক্ষরকেও শাশ্বত মন্ত্রে প্রবাহিত করতে সক্ষম? সমরেশ মজুমদার তাই দুর্লভ লেখকশ্রেণির একজন।
তাই, কি অনায়াসে লিখতে পারেন – ‘নাটকের সংলাপ তো মিথ্যে কথা নয়। জীবনের কথা। হয়তো সে জীবন তোমার নয়’ ( কলিকাতায় নবকুমার) অথবা ‘আমাদের মধ্যে অনেকগুলো একা আছে। প্রয়োজন চলে যাওয়ার সময় একেকটি জানান দেয়। এই করতে করতে যখন সব একা ভেঙে পড়বে তখন চুপচাপ শেষ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই’ ( গীতবিতান ছুঁয়ে বলছি)।
বর্তমানে বাঙালির বিশ্বে ব্যক্তিসত্তার সংকট রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। নান্দনিক আবেদন এবং অগভীর কৌশলের মাধ্যমে বহুমাত্রিক এই সংঘর্ষ গল্পে ধরা সম্ভব নয়। আধুনিক অধিকাংশ কথাসাহিত্যিক কার্যত বাস্তবের কথা বলে জীবনবোধ যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে এসে হোঁচট খেয়েছেন শূন্যায়তনের তল খুঁজে না পেয়ে। হাতড়ে বেড়িয়েছেন নিজেরই নির্মিত কৌশলী অনুভবী ভুবন এবং নান্দনিক নিঃসঙ্গতা। পুনরায় পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে দরকার পর্যাপ্ত জীবন অভিজ্ঞতা এবং নিহিত বয়ান। কালগত দূরত্ব এবং ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতের কারণে নির্মিত লেখা অনেকাংশে পড়ুয়া পাঠকের কাছে নিরর্থক হয়ে পড়ছে। খুব জরুরি হয়ে পড়ছে দেশ – সময় নিরপেক্ষ লেখাগুলির অন্বেষণ এবং পুনঃপাঠের মাধ্যমে নতুন মূল্যবোধের নির্যাস যোগাড় করা। সংশোধিত সময়কে উপেক্ষা করেই বাস্তবিক জীবন পাঠ আস্বাদন করা দরকার। লিখনপ্রক্রিয়ার তাৎপর্য যেহেতু লেখাকে সজীব রাখতে সাহায্য করে, তাই সমরেশ মজুমদার নতুন রূপে আবিষ্কৃত হন ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে।
লেখককে প্রাসঙ্গিক থাকার জন্যে একসময় বিনির্মাণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। নতুন করে ভাবতে হয় নিজের লেখা নিয়ে, ভাবনা নিয়ে। সময়ের তাৎপর্য স্বীকার করতে হয়। অহেতুক পুনরুক্তি ভালো লেখকের সংজ্ঞা নয়। সমরেশ মজুমদারের বিভিন্ন সময়ে লেখা গল্প বা উপন্যাস পাঠ করার সময় তার এই সময়কালীন যাত্রা পাঠক সহজেই বুঝে নিতে পারবেন। তার লেখায় স্পষ্ট, তিনি স্থবির ছিলেন না। জীবন স্রোত হারিয়ে ফেলেননি। পাঁকে নিশ্চল না হয়ে পড়ে, ভিন্ন সময়ের তাৎপর্য অন্তর্বৃত স্বরের মাধ্যমে প্রকট হয়ে উঠেছে। লেখক হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে এবং পরবর্তী ষাট বছর নিরবিচ্ছিন্ন লিখে গেছেন তিনি। এই সময়কালে নিজেকে বহুবার ভেঙেছেন এবং নতুন করে গড়েছেন। যে কোনো গল্প মূলত সে সময়ের বর্তমান তুলে ধরার চেষ্টা করলেও লেখক অনেকটা সময় ধরে লিখে যেতে থাকলে আত্ম পুনরাবৃত্তি ও প্রকরণ সারবস্বতার স্বীকার হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। এই অদৃশ্য বন্ধন ভেঙে বেরিয়ে আসা সবার পক্ষে সম্ভব হয়না। সমরেশ মজুমদার সযত্নে একেকটি দশকের অন্তর্নিহিত অবস্থান বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে উপস্থিত করেছেন লেখায়। ভিন্ন সময়ের ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে জীবনের স্পন্দন এবং সৌন্দর্য আবিষ্কার করে যেতে যেতে তৈরি করে নিয়েছেন নিজস্ব পরিসরের পাঠকৃতি। সংবেদনশীল আত্ম বিনির্মাণের প্রবণতা সমরেশ মজুমদারকে সর্বদা আধুনিক এবং প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
সমরেশ মজুমদারের লেখা তাই পুনরাবিষ্কৃত করার আনন্দ সমৃদ্ধ পাঠকের কাছে যেন আলোয় ফিরে আসা। কারণ তিনি শুধু জীবন লিখে যাননি, তার আখ্যানের দ্বিবাচনিক পরিসরে চমৎকৃত বাস্তবিক ভাষ্যে জীবন বিন্যাসের সন্দর্ভ বুঝিয়ে গেছেন।










