Home / প্রবন্ধ / আমরা সবাই রাজা

আমরা সবাই রাজা

সংবিধানে বর্ণিত সাম্য ও অধিকারের আদর্শ এবং ভারতের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রূঢ় বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান কতটা ? লিখলেন মুকুট তপাদার

প্রজাতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষগুলো প্রজাতন্ত্রর সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। কিন্ত সংবিধান সবার অধিকার নিশ্চিত করে। তবু সব অধিকার বারবার যেন কাগজেই থেকে যায়। কাঠামোর ফাঁক দিয়ে সকল গোষ্ঠীদের সুরক্ষা অরক্ষিত হয়ে থেকে যায়। প্রান্তিক অর্থ শেষ, কিন্ত কবির কথায় বলা যায়, শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে? ওই মানুষেরা বিশ্বস্ত, দেশের ভিত্তি ও দেশের স্বরূপ। সংবিধান অনুযায়ী নিয়মকানুন সর্বত্র এক। তাও দেশের ভেতরে সাঁওতাল-বাগদি-বাউরি-খেড়িয়াদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গলগুলো একটু একটু করে গ্রাস হয়ে যাচ্ছে কর্পোরেটদের দখলদারিতে। ‘জমিনের লড়াই’ বাংলার প্রাচীন লড়াই। রাজা চিরকাল সকলকে সমান অধিকার নিশ্চিত করেন। জলমাটিবায়ু থেকে উঠে আসা মানুষেরা কখনওই বৈদেশিক ছাঁচে ঢালা রাজশক্তির পরিকল্পনা সমর্থন করতে পারেনি। খুঁজে নেয় বেঁচে থাকার জন্যে বিকল্প জীবনদর্শন।

২০২৩-২৪ সালে (PLFS) রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে ২০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। অন্যদিকে, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। আর নিম্নবর্গের মানুষ ছোট ছোট জীবনের গল্পে হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের কথা কে ভাববে? আমরা শুধুই এমন একটা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি যেখানে দেশের মধ্যে নিম্নবর্গ মানুষের সংকট দূরীকরণ হবে। কিন্তু বাস্তবে অন্য চিত্র। ভূমিহীন কৃষক ও অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ প্রকৃতির কাছে চিরকাল পাঠ নিয়েছে। বিভিন্ন লোকাচার ও উৎসবে তাদের ইতিহাসবোধ একটু হলেও আছে। দিনযাপনের আড়ালে তারা লোকসংস্কৃতির গল্প বলে। যাত্রা, গান, বিভিন্ন কথকথাতে বেঁচে আছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস। উপজাতিরা রাজন্যর কাছে প্রজা পালন পেয়েছেন। যদি ত্রিপুরার কথা আসে, বলতেই হয় সেখানকার গানের সঙ্গে নাচের পরিবেশন। বহু চরিত্র, রাজ্যের কথা ও উপজাতিদের বিষয়ে ইঙ্গিত করে এই গানগুলো। যার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের।

অতএব, ত্রিপুরার মত বহু জায়গা আজ অশান্ত। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ফায়দা তুলছে। অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষরা নুন্যতম যেটুকু দাবি জানায় তাও তাদের সেই ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। গণতন্ত্র বাঁচাও ব্যক্তিরা স্বনিয়ন্ত্রণের কথা বলেন ঠিকই তবে সময়ের সঙ্গে বহু প্রস্তাবনার প্রতিটি শব্দ হারিয়ে যায়। ভিন্নমতকে আমরা পারিনা সহজে গ্রহণ করতে। সেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সময়েও অন্ত্যজ বা তথাকথিত নিচু জাতের মানুষদের মধ্যে একই দৃষ্টান্ত দেখা যায়। মহাপ্রভু সাম্যবাদের পথে সাধারণ শ্রেণীর মানুষদের মুক্তির দিশা দেখিয়েছিলেন। ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে শাসকের কাছে পৌঁছে দেন মানুষের দুঃখ দুর্দশা। সুলতানের কর্মকর্তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আম মানুষকে একসূত্রে গাঁথেন। ষোড়শ শতাব্দীতে মহানদীর পাড় ঘেঁষে সকল গ্রামে গঞ্জে পৌঁছে দেন উদারনীতি, ভক্তিরস ও প্রেম।

রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তিত হওয়ার পরেও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় আদিবাসী বা দলিতদের আস্থা অর্জন আজও বড়ই কঠিন। অনটনের যুদ্ধে ভোট আসে যায়। তাদের জীবনের মান একই থেকে যায়। ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি খোলে কই। পাওয়া, না পাওয়া, হারানো – তারা আপাতবিস্রত অনটনের কঠোর বাস্তবের সঙ্গে। উচ্চবর্গের কাছে নিম্নবর্গের ফরিয়াদ স্বীকৃতি পায় কি? ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ সংবিধান সভা কর্তৃক সংবিধান রচনার সময় সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলেন। যাতে সার্বভৌম ভারতে সকল গোষ্ঠীভুক্ত ও অধিবাসীই যেন সন্তুষ্ট হতে পারেন। সকলেই নিজ ধর্মচর্চা, শিক্ষা ও নিজের উন্নতি সাধনে স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারেন। কিন্ত এখানকার সময়ে সাংবিধানিক গনতন্ত্র রক্ষার দিকে আরো রাষ্ট্রশক্তিকে সংগঠিত হতে হবে। ভারতে সকল গোষ্ঠীভুক্ত মানুষ প্রজা নয়, কুণ্ঠিত নয়, প্রভু দাস ভাবে নয়, জীবনভর স্বাধীনভাবে রাজার মত বাঁচবে। দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, “ইতিহাসে এমন কোন সাক্ষ্য নেই, সমাজ ভালোর দিকে যাবে। কিন্ত ভালো কিংবা উন্নত সমাজ নির্মাণে মানুষের বাসনা আছে।”

পোড়ামাটি চিত্রতে পুরাণ ও সমাজচিত্র

বুদ্ধর নির্বাণ এর পরে এক হাজার বছর ছিল বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ। দরিদ্র মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য তিনি পথ দেখান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশ উন্নত হবে না। উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে। সর্বপরি, দরিদ্র মানুষের স্বার্থ, দেশের জাতীয় স্বার্থ।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *