রানিগঞ্জ ও আসানসোল : আসানসোল রানিগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা।
যা নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে, মোটা মুনাফা পাওয়া যাবে, এই ফাঁদে পা দিয়ে, ১৫ কোটি টাকারও বেশি খোয়ালেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জের এক চিকিৎসক।
জানা গেছে, সাইবার অপরাধী বা প্রতারকেরা এক মাস ধরে পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জের বাসিন্দা চিকিৎসক ডাঃ অরুণ কুমার শর্মাকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য নানা ভাবে প্রলোভন দেখিয়েছিল। তার একাউন্টে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঢুকে যাবে এমন প্রলোভন দেখিয়ে ১৫ কোটি ৮৩ লক্ষ ৯০ হাজার টাকার বিনিয়োগ করিয়ে নেয় সাইবার অপরাধীরা।
জানা গেছে, এরপরই রানিগঞ্জের বাসিন্দা ডাক্তার অরুণ কুমার শর্মা এক মাসের মধ্যে এই টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। আসানসোল রানিগঞ্জ খনি এলাকায় গত কয়েক বছরে কয়েক কোটি টাকার সাইবার অপরাধের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। তবে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটে ( এডিপিসি) সাইবার জালিয়াতির এত বড়ো ঘটনা ঘটলো। স্বাভাবিক ভাবেই এই ঘটনা গোটা শিল্পাঞ্চলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
জানা গেছে, সাইবার অপরাধীরা রানিগঞ্জের রামবাগানের ডক্টর্স কলোনির বাসিন্দা শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ অরুণ কুমার শর্মার থেকে ১৫ কোটি ৮৩ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা ২৪ অক্টোবর থেকে ২৫ নভেম্বরে মধ্যে বিনিয়োগ করিয়েছিলেন। তিনি যখন তার একাউন্টে টাকার পরিমাণ ২০০ কোটির মতো দেখতে পান। সেই সময় তিনি সেই টাকা তুলতে যান। তখন অপরাধীরা কমিশন হিসেবে ১২.৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত জমা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকের কাছে দাবি করে। তখনই চিকিৎসক বুঝতে পারেন যে, তিনি সাইবার জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টালে অভিযোগ দায়ের করেন। পরে শুক্রবার রাতে তিনি আসানসোলের সাইবার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার ভিত্তিতে, পুলিশের তরফে (মামলা নম্বর ৭৭/২৫) ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩১৬(২)/৩১৮(৪)/৩১৯(২)/৩৩৬(৩)/৩৩৮/৩৪০(২)/৬১(২) নং ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়।
এই প্রসঙ্গে আসানসোল দুর্গাপুর নগরের ডিসিপি ( হেড কোয়ার্টার) ডঃ অরবিন্দ আনন্দ বলেন, বিনিয়োগ করিয়ে মোটা মুনাফার লোভ দেখিয়ে ১৫ কোটি ৮৩ লক্ষ ৯০ হাজার টাকার জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ মামলা করে তদন্ত শুরু করেছে। এটি এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা বলে পুলিশ আধিকারিকরা মনে করছেন।
সাইবার অপরাধীরা কী ভাবে ডা. শর্মাকে ফাঁদে ফেলেছিলেন?
ডা. শর্মা বলেন, আমাকে মোনার্ক ভিআইপি নামে একটি হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে যুক্ত বা এ্যাড করা হয়েছিল। গত ২৩ অক্টোবর আমি সেই গ্রুপে রেসপন্স করি। এর পরে আমাকে একটি ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খুলতে বলা হয়। যেখানে আমি আমার ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করতে রাজি হয়েছিলাম। এরপর আমি গুগল প্লে স্টোর থেকে মোনার্ক অ্যাপ ডাউনলোড করি।
তিনি আরও বলেন, গত ২৪ অক্টোবর আমি প্রথম ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করি। যা আমার অ্যাকাউন্টের বিবরণ ও ট্রেডিং অ্যাপ্লিকেশনের পরিমাণ থেকে প্রতিফলিত হয়। দেখে এমনটা মনে হয়েছিল যে, আমার বিনিয়োগ শুরু হয়ে গেছে। মোনার্ক ভিআইপি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের গ্রুপ অ্যাডমিন হিসেবে পরিচয় দেওয়া অনুশ্রী শাহ নামে এক মহিলা নিজের পরিচয় দিয়েছিল। ওই মহিলা গোটা প্রক্রিয়াটা পরিচালনা করেছিলেন। এরপর সেই মহিলা বিশ্বাস অর্জনের জন্য, মোনার্ক নেটওয়ার্ক ক্যাপিটাল “সেবি ” রেজিষ্ট্রেশন নিশ্চিত করেছিল। তার নথিও দিয়েছিল। এরপরে আমি, গত ২৪ অক্টোবর থেকে ২৫ নভেম্বরের মধ্য মোট ১৫ কোটি ৮৩ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করি। এরপর যখন আমি আমার টাকা তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু তা আমি করতে পারিনি। সঙ্গে সঙ্গে আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করি। তখন আমার কাছ থেকে কমিশন হিসেবে অতিরিক্ত ১২.৫০ কোটি টাকা জমা দিতে বলা হয়। তখনই আমি বুঝতে পারি যে সাইবার জালিয়াতির শিকার হয়েছি।
আরও জানা গেছে, আসানসোল দুর্গাপুর কমিশনারেটে এখনো পর্যন্ত ৩ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকার সাইবার প্রতারণা বা জালিয়াতির অভিযোগ ছিল। যা আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের-এলাকায় ডিজিটাল গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে ঘটনা হয়েছিল। চলতি বছরের জুন মাসে এই ঘটনাটি ঘটে। আর বিনিয়োগ কেলেঙ্কারিতে সবচেয়ে বেশি প্রতারণার পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা। এই মামলাটি আসানসোলের সাইবার ক্রাইম থানায় গত ২৭ জুন নথিভুক্ত হয়েছিল।
আরো জানা গেছে, চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ব্যাংকক সহ একাধিক দেশ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, এই সাইবার অপরাধ চক্র চালিয়ে যাচ্ছে। এই সাইবার অপরাধীদের নাগাল পেতে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার থানার পুলিশ কোমড় বেঁধে নেমেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ধরনের সাইবার অপরাধ মোকাবিলার জন্য কমিশনারেটকে আরও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেই প্রযুক্তিবিদরা মনে করছেন।
পুলিশ এখন তদন্তের মাধ্যমে গোটা বিষয় ও অভিযোগ তদন্ত করে দেখছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিককালে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটির মতো টাকা সাইবার অপরাধের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে উদ্ধারের জন্য তৎপরতার সঙ্গে তদন্ত করে সফলতাও পেয়েছে পুলিশ।
এখন দেখার এই বিশাল পরিমাণ টাকা কী ভাবে উদ্ধার করে সাইবার থানা।










