জয়ন্ত মণ্ডল
পাঁচ বছর আগে সংসদে পাশ হয় চারটি শ্রম বিধি। এ বার তার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন শ্রম বিধি কার্যকর হওয়ার ফলে কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত খুলেছে ঠিকই, কিন্তু এই পরিবর্তনের গতিপথ ঘিরে উদ্বেগও কম নয়। একদিকে ছুটি পাওয়া সহজ হয়েছে, কর্মঘণ্টা ভাগ করার স্বাধীনতাও বেড়েছে, আবার অন্যদিকে বাস্তবে এসব নিয়ম ঠিক কী ভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়ে শ্রমিক সংগঠন, বিশেষজ্ঞ এবং কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
দেদার সামাজিক সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে নতুন শ্রম বিধিতে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ছুটি, চিকিৎসা সুবিধা এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ঠিক সেই একই অধিকার দিতে হবে, যা স্থায়ী কর্মীরা পান। এতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, চাকরির ধরন ভিন্ন হলেও সুবিধা সমান হওয়ায় বৈষম্য কমবে। সরকারের যুক্তিও তাই—একই প্রতিষ্ঠানে একই কাজ করলে দুই ধরনের কর্মীর মধ্যে আর্থিক বৈষম্য থাকা উচিত নয়।
নতুন আইনে, ছুটি পাওয়ার জন্য বছরে কাজের সময়সীমা ২৪০ দিন থেকে কমিয়ে ১৮০ দিন করা নিঃসন্দেহে কর্মীবান্ধব পদক্ষেপ। এতে কর্মীরা বছরের মাঝামাঝি থেকেই বিশ্রামের অধিকার পাবেন। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে ছুটি মঞ্জুর করা বা ছুটি নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা—এগুলো এখনও বড় সমস্যা। অনেক বেসরকারি সংস্থায় ছুটি নিলেই খুঁতখুঁতে নজরদারি চলে। কারণ, সেখানে কর্মীর উপস্থিতির দিকে তাকিয়ে বেতন বা প্রোমোশন নির্ধারণ হয়। নতুন আইনে নিয়ম কমলেও মানসিক চাপ বা কর্মস্থলের সংস্কৃতি যে সহজে বদলে যাবে, এমন প্রত্যাশা করা কি খুবই সহজ। আইন কার্যকর হলেও প্রয়োগে দুর্বলতা থাকলে কর্মীরা ছুটি নীতির আসল সুবিধা পেতে নাও পারেন।
কর্মঘণ্টার নমনীয়তা প্রথমে শুনতে ভালো লাগলেও এর মধ্যেও একটি বিপদ লুকিয়ে আছে বলে মনে করেছেন অনেকে। সপ্তাহে ৪ দিন ১২ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ অনেকের কাছে সুবিধাজনক মনে হলেও শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত দীর্ঘ কর্মদিবস শারীরিক ও মানসিক ভাবে ক্লান্তি বাড়াতে পারে। ভারী কাজ, যন্ত্রপাতি চালানো বা শিফট ভিত্তিক শিল্পে অতিরিক্ত সময় কাজ করলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া নমনীয়তা শব্দটি বাস্তবে অনেক সময় নিয়োগকর্তার পক্ষে যায়। অর্থাৎ কর্মীর ইচ্ছার চেয়ে কোম্পানির প্রয়োজনই মূল হয়ে দাঁড়ায়। ওভারটাইমে সম্মতি বাধ্যতামূলক বলা হলেও, অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা চাপের মুখে সম্মতি জানাতে বাধ্য হন। সেখানে বিধি বন্দি রয়ে যায় কাগজেই।
৪০ বছরের পর বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু শিল্পক্ষেত্রে স্বাস্থ্যপরীক্ষার মান কেমন হবে, পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—এসব প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক জায়গায় কর্মীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য কোম্পানির নজরে গিয়ে চাকরি হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এই আশঙ্কাও অমূলক নয়। এছাড়া দেশের বিশাল কর্মশক্তির তুলনায় পরিকাঠামো প্রস্তুত কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
নতুন শ্রম বিধির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—রাজ্যগুলো নিজের মতো করে ওভারটাইমের সীমা নির্ধারণ করতে পারবে। এতে কর্মীদের আয়ের সুযোগ যেমন বাড়ে, তেমনই কর্মঘণ্টার বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা থাকে। একটি রাজ্যে শ্রমবান্ধব সীমা থাকলেও অন্য রাজ্যে তা অত্যন্ত শিথিল হতে পারে। ফলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলের কর্মীদের মধ্যে সুবিধা-অসুবিধার ব্যবধান বাড়বে, যা শ্রমবাজারে অসাম্যের অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
সর্বোপরি, নতুন শ্রম আইন কর্মক্ষেত্রে আধুনিকতা আনতে চাইলেও এর বাস্তব প্রয়োগে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। আইন বদলানো সহজ, কিন্তু শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির কী হবে! অনিয়ন্ত্রিত কাজের চাপ, আনুষ্ঠানিক ভাবে না হলেও চাপে ওভারটাইম করানো, অসুরক্ষিত পরিবেশ, ছুটি নিতে বাধা, স্বাস্থ্যবিধির দুর্বলতা—এসব দূর করতে হলে শুধু নিয়ম নয়, প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও সংস্থার মানসিকতার পরিবর্তন।
সবমিলিয়ে, নতুন শ্রম আইনকে শুধু সুবিধার চশমায় দেখা উচিত নয়। এতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নতি কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে বাস্তব প্রয়োগ, প্রতিষ্ঠানগুলির দায়বদ্ধতা এবং সরকারের পর্যাপ্ত নজরদারির উপর। এই সমস্ত দিক মিলিয়েই শ্রম আইনকে কর্মীদের জীবনের সত্যিকার উন্নতি ঘটানোর হাতিয়ার করে তোলা সম্ভব। নইলে আর পাঁচটা পরিবর্তনের ঘোষণার মতোই এটাও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে যাবে!










