Home / প্রবন্ধ / এসআইআর এখন নতুন থ্রিলার

এসআইআর এখন নতুন থ্রিলার

জয়ন্ত মণ্ডল

এক্কেবারে নতুন একটা মরশুম। কালীপুজোর টুনিলাইট খোলা হয়ে গেছে। সকালের আকাশে হালকা কুয়াশা, ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব। টিভিতে যতই নিউজ চ্যানেল বদলান, বিষয় একটাই—এসআইআর! না, এটা কোনও নতুন রিয়্যালিটি শো নয়। সুপার রিয়্যালিটি। কেউ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয়ে ঘামছে, কেউ ২০০২-এ নাম আছে দেখে ফরমের প্রেমে পড়ছে!

ক’দিন আগে পর্যন্ত আমরা দেখেছি, ‘দুয়ারে সরকার’, ‘দুয়ারে রেশন’ স্লোগানে মানুষ বেশ উৎসাহিত। এখন সময় এসেছে—’দুয়ারে বিএলও’-র! হাতে ফাইল-ফর্ম নিয়ে হাজির তিনি। “আপনার ভোটার কার্ড আছে?… বাবা-মায়ের নামটা বলুন!… ফরমটা ভরে রেখে দেবেন। ভুল লিখবেন না। আমি এসে নিয়ে যাব…”। বয়স্কা ঠাকুমা থেকে গৃহবধূ, ছেলে-ছোকরা সবাই তাঁর চারপাশে মাছির মতো ভনভন করছে। আর বাস-ট্রেন-মেট্রোয় অফিসযাত্রীদের মধ্যে তুমুল চর্চা—“দাদা, নথি না দিলে না কি ভোটার কার্ডটা চলে যাবে!” কেউ বলছে, “এটার খুব দরকার ছিল।” কারও মন্তব্য, “মানুষকে মাতিয়ে রাখাই সরকারের কাজ।”

এরই মধ্যে শহর-গ্রামে নানা অদভুতুড়ে কাণ্ডও ঘটছে। কেউ ভোটার তালিকায় নিজের নাম আছে কিনা দেখতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছেন, তিনি এখনও ‘অবিবাহিত’। কেউ আবার দেখেছেন, তাঁর ঠিকানা অন্য পাড়ায় চলে গেছে। কেউ বলছেন—“আমার নাম মুছে গেছে!”, একটা আধবুড়ো লোক আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল—“অবশেষে আমার শ্বশুরবাড়ির সকলের নাম ২০০২-এর লিস্টে পাওয়া গেছে!” মানে, বউকে ‘বাঁচানো’ যাবে। এক মহিলা অবিবাহিত বেলার ভোটার কার্ড বের করে দেখালেন, তাঁর নামের নীচে মায়ের নাম লেখা আছে। আর সম্পর্কের জায়গায় লেখা আছে ‘স্বামী’। বুঝুন ঠ্যালা, বর্তমান স্বামী আবার এই রহস্য সমাধানে শার্লক হোমস সাজছেন। তবে একটা জিনিস মানতেই হবে—এই প্রক্রিয়া না হলে ‘প্রদীপ’ হয়তো জানতেই পারত না, একয়ুগে ভোটার কার্ডে তার নামটা ‘পরদিপ’ লেখা ছিল! সুরঞ্জন প্রামানিকের ছেলেরা জানত না তারা এক দিন ‘পরমনিক’ ছিল।

একইভাবেই সোশ্যাল মিডিয়াতেও এখন নতুন ভৌতিক গল্প এসআইআর। ফেসবুক আর ইউটিউবে গাদাগুচ্ছের ভিডিও। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন। কী ভাবে এসআইআর ফরম ফিলআপ করবেন? একেক জন একেক রকম বলছে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন বিবাহিত মহিলা ভোটাররা। কারও ফরম দিয়ে গেছে বাপের বাড়িতে। কেউ আবার ভেবে পাচ্ছেন না, পিতা/অভিভাবকের জায়গায় বাবা না কি স্বামীর নাম লিখবেন। তাঁরা বেশি বেশি করে ইউটিউব সার্চ করছেন। ভিডিয়োয় কেউ বলছে বাবার নাম তো কেউ বলছে স্বামীর নাম। বিভ্রান্ত হয়ে কেউ হেড অ্যান্ড টেল টস করে ফরমের ওই জায়গাটা ভরছেন। কেউ বিএলও আসার অপেক্ষা করছেন। এক বন্ধুর বউ বলল, “ক’দিন আগে মেয়েরা বিশ্বকাপ জিতেছে, আমি অভিভাবকের জায়গায় স্বামীর নাম কেন লিখতে যাব।” বন্ধু তীর্যক সুরে বলল, “হ্যাঁ, স্বামী বদলালেও বদলাতে পারে, বাবা বদলায় না।” ফলে সাংসারিক খিটিমিটির কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে কোথাও কোথাও। ফেসবুকেও দেখলাম নতুন ট্রেন্ড—“আজ আমার বাড়িতে বিএলও এসেছিল—ফিলিংস ওভারহেলমিং।” “বিএলও-র সঙ্গে সেলফি তুলে প্রমাণ রাখলাম—আমি ফরম পেয়েছি!”

পাশাপাশি, এসআইআর-কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও মন্দ হচ্ছে না। একেক জনের নামে দুটো করে ফরম দিয়ে যাওয়ার পরেও সেগুলোকে জেরক্স করতে দোকানে দোকানে লম্বা লাইন। এক জন তো বলল, “আমি বাবা প্রথমে জেরক্স করা ফরমে পেনসিল দিয়ে ফিলআপ করে তাপ্পর ওরিজিনালটা ভরব”। শুধু কি জেরক্স, কোনো রকমে টিকে থাকা স্টুডিওগুলোতেও ছবি তোলার হিড়িক। পাড়ার একটা মুদি দোকানেও দেখলাম ৩০ টাকায় ৫টা পাসপোর্ট ছবি বানিয়ে দিচ্ছে।

ও দিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থাও বেশ চনমনে। কেউ বলছে, “এটা এনআরসির মহড়া”, কেউ বলছে “নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে বিজেপির ষড়যন্ত্র”, আবার কেউ বলছে “এতে আমরা নিশ্চিত ভাবে জিতব”—কী যে জিতবে, তা মোটেই গবেষণার বিষয় নয়! কেউ আবার ভোটরক্ষার ক্যাম্প খুলে ফেলেছে। সেখানে পোর্টেবল প্রিন্টার, ২০০২ সালের ভোটার লিস্টের হাতে গরম কপি বেরোচ্ছে। ফরম ফিলাপও করে দিচ্ছে। সত্যি বলতে, এই এসআইআর যেন এক বিশাল গণ-মনস্তাত্ত্বিক অভিযান। যেখানে কেউ ভয় পাচ্ছেন, কেউ বুঝছেন না, আবার কেউ নিছক ফর্মে ভুল লিখে, ফের ঠিক করে রোমাঞ্চিত হচ্ছেন।

অন্য দিকে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা শান্ত গলায় বলছেন, “আতঙ্কের কারণ নেই। এটা শুধুমাত্র সংশোধন প্রক্রিয়া।” কিন্তু মানুষ জানে—যখন সরকার বলে “ভয় পাবেন না”, তখনই ভয় পাওয়ার সময় এসেছে! কারণও আছে। কমিশন তার পরেও বলছে—“সবার জন্য সুযোগ আছে, আতঙ্ক নয় সচেতনতা বাড়ান।” কিন্তু আমরা তো জাত ‘আতঙ্কপ্রিয়’। উৎসব-আনন্দে পটকা না ফাটালে যাদের ঘুম আসে না, উত্তাল সমুদ্রে চান না করলে যাদের ভ্রমণ মাটি, তাদের কাছে ভোটার তালিকার এসআইআর-ই এখন নতুন ‘থ্রিলার’।

alternatetext
Tagged:

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *